ইতালি যখন করোনাভাইরাসে বিপর্যন্ত অর্থনীতিকে টেনে তোলার চেষ্টা করছে, তখন স্থানীয় জনগণের মধ্যে নিজেদের সমর্থন তৈরি করে নিচ্ছে মাফিয়ারা। কোয়ারেন্টিনে থাকা দরিদ্র পরিবারের মানুষ যাদের খবার কেনার অর্থ নেই, তাদের খাবার দিচ্ছে তারা। এ খবর জানিয়ে ইতালীয় কর্তৃপক্ষ সতর্ক করেছে স্থানীয় জনগণকে।

সম্প্রতি কুখ্যাত মাফিয়া গ্যাং জরুরি খাদ্যসহায়তা দিচ্ছে, এমন বেশ কিছু ভিডিও প্রকাশ করা হয়। এতে দেখা যায়, করোনাভাইরাসে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত ইতালির দক্ষিণাঞ্চলের ক্যাম্পানিয়া, ক্যালাব্রিয়া, সিসিলি ও পুগলিয়ায় খাদ্যসহায়তা দিয়েছে মাফিয়ার অপরাধ জগতের মানুষ।

মাফিয়াবিরোধী কর্মকর্তা ও কাতানজারোয় কৌঁসুলি অফিসের কর্মকর্তা নিকোলা গ্রাত্তেরি গার্ডিয়ানকে বলেন, এক মাসের বেশি সময় দোকানপাট, ক্যাফে, রেস্তোরাঁ এবং পাব বন্ধ। লক্ষাধিক মানুষ এসব অনানুষ্ঠানিক খাতে কাজ করেন। প্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধ থাকা মানে, এই মানুষগুলোর রুটি-রুজির পথও বন্ধ আছে গোটা সময়জুড়ে। আবারও কবে তাঁরা কাজে ফিরতে পারবেন তার নিশ্চয়তা নেই। সরকার নামকা ওয়াস্তে এদের জন্য ‘শপিং ভাউচার’ ইস্যু করেছে। যদি শিগগিরি সরকার এই পরিবারগুলোর পাশে না দাঁড়ায়, তাহলে মাফিয়ারা জনজীবনের ওপর তাদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করবে।

ইতালিতে লকডাউন একটা জটিল পরিস্থিতি তৈরি করেছে। এর শিকার হয়েছেন প্রায় ৩৩ লাখ মানুষ, যাঁরা আনুষ্ঠানিক কোনো খাতে কাজ করেন না। ভেনিসভিত্তিক সিজিআইএ মেস্ত্রে বলছে, ক্ষতির শিকার অন্তত ১০ লাখ মানুষ থাকেন দক্ষিণাঞ্চলীয় শহরগুলোয়। ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের সংগঠনটি বলছে, ছোট ছোট দোকানমালিকদের বিনা মূল্যে খাবার সরবরাহের জন্য চাপ দেওয়া হচ্ছে। পুলিশ টহল দিচ্ছে যেন সুপারমার্কেটগুলো থেকে কিছু খোয়া না যায়। ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে সরকারের স্থবিরতার বিরুদ্ধে মানুষ প্রতিবাদ করছে। এমন ভিডিও ভাইরাল হয়েছে যেখানে মাত্র ৪৪ ডলার ঋণ চেয়ে বারিতে ব্যাংকের কলাপসিবল গেট আঁটা দরজায় ঘুষি দিচ্ছেন এক ব্যক্তি। এমন একটা পরিস্থিতিতে আগুনে ঘি ঢালার মতো ঘটনা ঘটাতে চলেছে মাফিয়ারা।

সামাজিক এই বিশৃঙ্খলার বিষয়টি প্রথম আঁচ করতে পেরে ইতালীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লুসিয়ানা ল্যামোরজেস বলেন, মাফিয়ারা দরিদ্রতার সুযোগ নিতে পারে, নিজেদের সংগঠনে নিয়োগ দিতে পারে মানুষকে। অথবা পাস্তা, পানি, ময়দা বা দুধ সরবরাহ করে নিজেদের জায়গা করে নিতে পারে।

সম্প্রতি নেপলসের দারিদ্র্যপীড়িত অঞ্চলে পুলিশের উপস্থিতি বেড়েছে। ক্যামোরায় নিপলিটান মাফিয়ার লোকজন বাসায় বাসায় খাবার পৌঁছে দিচ্ছে। ম্যাজিস্ট্রেটরা স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে খাবার বিতরণের সময় একদল লোককে জেরা করেন। লা রিপাবলিকা বলছে, পালারমোতে কোসা নস্ত্রার ভাইকে ‘যেন’ এলাকায় খাবার বিতরণ করতে দেখা গেছে। ‘যেন’–এ মাফিয়াদের শক্ত উপস্থিতি আছে। এ খবর ছড়িয়ে পড়লে ওই ব্যক্তি ফেসবুকে আত্মপক্ষ সমর্থন করে একটি পোস্ট দেন। তিনি বলেন, তিনি শুধু দাতব্য কাজ করছিলেন।

অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটির অপরাধবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ফেডেরিকো ভারেজে বলেন, মাফিয়ারা শুধু অপরাধী সংগঠন নয়। এরা আশা করে বিভিন্ন অঞ্চল, বিপণিবিতান তাদের দখলে থাকবে। পর্যবেক্ষরা প্রায়ই মাফিয়াদের অর্থনৈতিক বিষয়-আশয় নিয়ে কথা বলেন, কিন্তু বিভিন্ন অঞ্চলে তাদের শক্তির যে ভিত সে কথাটা ভুলে যায়।

খাবার বিতরণ মাফিয়াদের মতোই খুবই পুরোনো কৌশল। ইতালির দক্ষিণে মাফিয়ারা নিজেদের মানবদরদী ও স্থানীয় পর্যায়ে ক্ষমতাধর হিসেবে উপস্থাপন করে। প্রথম প্রথম তারা কোনোকিছুর প্রত্যাশা করে না এমন একটা ভান ধরেই কাজ করে যায়।

গ্রাতেরি বলেন, মাফিয়া বসরা তাঁদের শহরকে নিজেদের তালুক বলে বিবেচনা করেন। এই তালুক চালাতে হলে এলাকার লোকজনকে দেখেশুনে রাখতে হবে বলেও মনে করেন তাঁরা। এসব কাজের ফাঁকে তাঁরা তাঁদের নিজেদের আখের গোছান। মানুষের চোখে সেই বসই ভালো, যে দোরগোড়ায় খাবার পৌঁছে দেয়। বস জানেন, যে পরিবারগুলোর কাছে তিনি গেছেন, সেগুলোই একসময় তাঁর কাজে আসবে। যেমন মাফিয়ারা নির্বাচনের সময় কোনো একজন রাজনীতিকের পক্ষে দাঁড়াতে পারেন। ওই রাজনীতিক হয়তো পরে মাফিয়া বসের স্বার্থ দেখেন।

ভারেজে বলেন, মাফিয়ারা যা বিলাচ্ছে, এটাকে উপহার ভাবা ভুল। মাফিয়ারা সহানুভূতিশীল হয়ে কিছু করে না। কোনো না কোনো উপায়ে উশুল করে নেয়। পালিয়ে থাকা সন্ত্রাসীকে সহযোগিতা, পিস্তল ধরা, মাদক কারবার বা যেকোনো কিছুতে উপকারভোগীদের ফাঁসিয়ে দিতে পারে তারা।

গ্রাতেরি বলেন, ‘মেক্সিকোর মাদক সম্রাট এল চাপোর বেলায় কী ঘটেছিল ভাবুন। তিনি টনকে টন কোকেন পাচার করেছেন, শত শত মানুষকে হত্যার অনুমতি দিয়েছেন। কিন্তু নিজের এলাকায় তিনি একজন মানবদরদী। মানুষ বলে তিনি অভাবগ্রস্ত পরিবারে ওষুধ পৌঁছে দিয়েছেন, রাস্তাঘাট তৈরি করেছেন। এখানকার চিত্রও এমন।’

চলতি সপ্তাহে ইতালির মাফিয়াবিরোধী কৌঁসুলির অফিস বলেছে, মাফিয়া বসরা অপরাধ করে সীমাহীন পুঁজির মালিক হয়েছেন। ইতালি যখন করোনাভাইরাসে বিপর্যন্ত অর্থনীতিকে টেনে তোলার চেষ্টা করছে, তখন স্থানীয় জনগণের মধ্যে তারা এই পুঁজি খাটিয়ে নিজেদের সমর্থন তৈরি করে নিচ্ছে। এ–ও অভাবগ্রস্তদের সঙ্গে মাফিয়াদের ব্যবসা। একসময় তাদের গিলে ফেলবে মাফিয়ারা। এই ব্যবসাকে তারা বিভিন্ন অপরাধ থেকে উপার্জিত টাকা পাচারের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করবে।

ভারেজে বলেন, এই লকডাউন থেকে মাফিয়ারা লাভ উঠিয়ে নিতে সক্ষম হবে যখন ইতালীয়রা আবার কাজে ফিরে যাবে, টাকাপয়সা খরচ করতে পারবে এবং অর্থনীতি তার পুরোনো ছন্দ খুঁজে পাবে। কিন্তু সত্যিই পালেরমো ও নেপলসে খাবারের পার্সেল পৌঁছে দেওয়াই বোঝায় মাফিয়াদের আসল চরিত্র কী এবং কেন তারা এত বিপজ্জনক।