দু’দিন পরই বাংলা নববর্ষ। প্রতি বছর এই সময়ে রাজধানীসহ গ্রামগঞ্জের সর্বত্র জমে ওঠে বৈশাখী বাজার। চৈত্রের শুরু থেকে নববর্ষের আগের দিন পর্যন্ত কেনাকাটার উৎসবে মেতে ওঠেন ক্রেতারা।

এতে ব্যবসায়ীদের মুখের হাসিও চওড়া হয়। কিন্তু এবার করোনা ঠেকাতে লকডাউনে চাপা পড়েছে সব। অভিজাত বিপণিবিতান, শপিংমল থেকে শুরু করে ফুটপাত পর্যন্ত বেচাকেনা বন্ধ। প্রায় সর্বত্রই ফাঁকা খাঁ খাঁ করছে। দেশব্যাপী বন্ধের জেরে এবার বদলে গেছে হালখাতার রঙ।

লাল রঙা সেই খাতার চাহিদা কমে গেছে। উৎসবের চেয়ে দোকানের কর্মচারীদের বেতন দেয়ার চিন্তায় অস্থির ব্যবসায়ীরা। এ জন্য সরকারের কাছে সাড়ে পাঁচ হাজার কোটি টাকার ঋণ প্যাকেজ আকারে দেয়ার জন্য প্রস্তাব দিয়েছে বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতি।

ব্যবসায়ীরা বলেন, রাজধানী ঢাকার বিভিন্ন শপিংমলের পাশাপাশি ছোট-বড় প্রায় সব দোকানেই এই সময়ে কেনাকাটার ওপর বিশেষ ছাড় থাকে। মফস্বল শহর তো বটেই গ্রামেও অস্থায়ী দোকান তৈরি করে বৈশাখী মেলা বসে।

বাড়তি রোজগারের আশায় অন্য বছর এই সময়ে দেশীয় ফ্যাশন হাউজগুলো নানা ধরনের পোশাক বাজারে নিয়ে আসে। ইলিশ মাছ, মিষ্টি, দই ও তরমুজসহ নানা ব্যবসায় চাঙ্গা হয়ে ওঠে স্থানীয় ব্যবসায়ী, এমনকি বেকার ছেলেমেয়েরাও। সেই রোজগার থেকে অনেকেই অন্য ব্যবসার মূলধনও জোগাড় করেন। কিন্তু এবার সব বন্ধ। এক কথায় বর্তমান পরিস্থিতিতে অনেকেরই মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ার অবস্থা হয়েছে।

জানতে চাইলে বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতির সহ-সভাপতি রেজাউল ইসলাম মন্টু শনিবার যুগান্তরকে বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে ক্ষুদ্র, মাঝারি ও বড় শিল্প ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। বৈশাখ উপলক্ষে বিভিন্ন পণ্য ও খাদ্যসামগ্রী বেচাকেনায় ধুম পড়ত।

কিন্তু এবার টানা ছুটি ও লকডাউনের কারণে তাদের ক্ষতির মুখে পড়তে হয়েছে। তিনি আরও বলেন, যেখানে পৃথিবীর অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, বাংলাদেশ এর বাইরে নয়। আমাদের দোকান কর্মচারীদের বেতন পরিশোধ করতে স্বল্পসুদে সাড়ে পাঁচ হাজার কোটি টাকার ঋণ প্যাকেজ ঘোষণা করার জন্য পরিকল্পনামন্ত্রীর কাছে লিখিত প্রস্তাব দেয়া হয়েছে।

এটি দেয়া হলে বেতন শ্রমিকদের ব্যাংক অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে দেয়া হবে। কারণ ব্যবসায়ীদের সবকিছু বন্ধ থাকায় কর্মচারীদের বেতন দেয়া কঠিন হয়ে পড়বে।

দক্ষিণ এশিয়ার বৃহত্তম শপিংমল যমুনা ফিউচার পার্ক, মধ্যবিত্তদের মার্কেট গাউছিয়া, নিউমার্কেট, সদরঘাটকেন্দ্রিক মার্কেটসহ শহরের ছোট-বড় ও মাঝারি দোকানের পাশাপাশি রাস্তার দু’ধারে চলে বৈশাখের কেনাবেচা। সেসব রাস্তা এখন খাঁ খাঁ করছে। নিউমার্কেটের একটি শপিং সেন্টারের মালিক জানান, বৈশাখী বাজারের জন্য মজুত এত টাকার জামাকাপড়, শাড়ি দিয়ে এখন কী করব সেটাই বুঝতে পারছি না।

নবর্বষ উপলক্ষে বেচাকেনার অন্যতম দেশীয় ফ্যাশন হাউজগুলো বড় ধরনের লোকসানে পড়েছে। কারণ এ মৌসুমে দেশীয় পোশাকের চাহিদা বেশি থাকে। ব্যবসায়ীরা জানান, সারা বছর তারা চৈত্র মাসের এই সময়টার জন্য অপেক্ষা করেন। ব্যবসা হারিয়ে আমরা আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছি।

এদিকে রাজধানীসহ সারা দেশের শহরগুলোতে এ সময় বসে বৈশাখী মেলা। ছোট ব্যবসায়ীর কথায়, এই মৌসুমে কমপক্ষে ২০ হাজার টাকার মুনাফা হতো। সেই টাকায় জিনিস কিনে গোটা বছর ব্যবসা করতাম। দোকান খুলতে না পারায় এই ক্ষতি সামলে কিভাবে বছরটা চালাব, ভাবতেই ভয় পাচ্ছি।

অভিজাত শপিংমলের বস্ত্র ব্যবসায়ী জাকির হোসেনের কথা, আগামী দিনে যদি কোনো বিকল্প ব্যবস্থা না করা যায়, তা হলে বড় প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি বহু ছোট ব্যবসায়ী তথা গরিব মানুষের ক্ষতি হয়ে যাবে।

রাজধানীর এলিফ্যান্ট রোডের ইস্টার্ন মল্লিকার ব্যবসায়ী তাজুল ইসলাম বলেন, সেলের জন্য মজুদ করা জিনিসপত্র বিক্রি করতে না পারায় বড় ক্ষতি হয়ে গেল। এটা যাদের হয়েছে তারাই কেবল বুঝবেন। উপায় নেই লকডাউনের সময় সামনে আরও বাড়ানো হলেও সেটি মানতে হবে। কারণ আগে তো প্রাণ।

এদিকে পোশাকের বাজারের পাশাপাশি এই সময়ে জমে ওঠে ইলিশ মাছ ও তরমুজের বাজারও। বাদ পড়ে না দই মিষ্টিও। এ সময় চাহিদা এত বেশি থাকে ইলিশ মাছের হালি ছয় থেকে আট হাজার টাকাও বিক্রি হয়। করোনার কারণে এ বছর চাহিদা ইলিশের নেই।

বাজারে অন্য বছরের এই সময়ের তুলনায় দামও কম। এক কেজি ওজনের ইলিশ ৮০০-৯০০ টাকায় পাওয়া যাচ্ছে। যা আগে দেড় হাজার টাকা গুনতে হতো। দুপুর ২টার পর দোকানপাট বন্ধ হয়ে যায়। ফলে ভিড় নেই তরমুজের দোকানেও। একই অবস্থা মিষ্টির দোকানেও।

করোনায় বদলে গেছে হালখাতার রঙ : প্রযুক্তির ভিড়ে হালখাতা কিছুটা জৌলুস হারিয়েছিল। লকডাউনের জেরে এবার পুরোপুরিই কমে গেছে লাল রঙে সেই হালখাতা নোটবুকের চাহিদা। ১৪ এপ্রিল বাংলা নববর্ষ। লকডাউন ২৫ এপ্রিল শেষ হলেও অধিকাংশ মানুষই মনে করছেন, ওই মেয়াদ আরও বাড়তে পারে। সে ক্ষেত্রে দোকানগুলোতে এ বছর ঘটা করে হালখাতা উৎসব করা কার্যত অসম্ভব।

এই বিপর্যয়ে মাথায় হাত পড়েছে বড় বাজারের হালখাতা বিক্রেতা থেকে ছোট-বড় দোকানদারদের। এমন কিছু যে হতে পারে তা আঁচ করতে পারেননি হালখাতার পাইকারি ব্যবসায়ীরা। পুরনো ঢাকার ব্যবসায়ী কাওছার জানান, গত কয়েক বছর ধরে কম্পিউটারের কারণে আমাদের ব্যবসা কিছুটা মার খেলেও চৈত্রের দিকে চেয়ে থাকতাম।

চাহিদা কমে গেলেও গত বছর এই সময়ে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে হালখাতা কিনতে দোকানে এসেছিলেন অসংখ্য মানুষ। করোনা, লকডাউন সব কিছু শেষ করে দিল। এর প্রভাব গিয়ে পড়ছে খাতা তৈরির ছাপাখানাতে। হালখাতা উপলক্ষে কার্ডের মাধ্যমে বিভিন্ন শুভেচ্ছা বার্তা জানানো হতো।

বিভিন্ন ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান হাজার কার্ড বিলি করত। বেসরকারি অনেক প্রতিষ্ঠানও এটি করেছে। কিন্তু এ বছর কেউ কার্ড ছাপাতে ছাপাখানায় যায়নি। এ খাতেও লকডাউনের প্রভাব পড়েছে।