আমাদের দেশের মানুষের স্বভাব হচ্ছে মিলিত হওয়ার আকাঙ্ক্ষা। আমাদের ইতিহাস দেখলে দেখা যায়, সেই ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে উনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থান; মুক্তিযুদ্ধ, মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী আন্দোলন—কত আন্দোলন-সংগ্রাম, সেগুলোতে কী দেখি আমরা? দেখি মানুষ আর মানুষ। মানুষের বাঁধভাঙা অংশগ্রহণ। মানুষের বাঁধভাঙা ঢল। সেই বাঁধভাঙা ঢলের মানুষগুলোকে একটি ব্যাধি অকস্মাৎ আক্রান্ত করে বসল।

ইউরোপের মানুষ প্রত্যেকে স্বতন্ত্রবাদী। তাদের পক্ষে একটি নোটিশ পাওয়া বা একটি সতর্কবার্তা পাওয়া মানে একটা নির্দেশনা। এই নির্দেশনা পেলেই তারা ঘরের মধ্যে গুটিয়ে যায়। কিন্তু আমাদের মানুষ তো গুটিয়ে যাওয়ার নয়। সে কারণে যেটা হচ্ছে—এত অনুশাসন, এত সরকারি নির্দেশ, এত পুলিশি অনুরোধ, এগুলো কোনো কাজে আসছে না।

একদিক দিয়ে আমাদের মানুষ অদৃষ্টবাদী, আরেক দিক দিয়ে অদূরদর্শী। এই অদূরদর্শী, অদৃশ্যবাদী মানুষগুলোকে একটি নির্দেশ দিয়ে বা একটি মারাত্মক ব্যাধির কথা বলে, তার মঙ্গলের কথা বলেও ঘরে আটকানো যাচ্ছে না। তবে আস্তে আস্তে কাজ কিছুটা হচ্ছে বলে মনে হচ্ছে। কয়েক দিন আগে যেটা দেখেছিলাম, ব্যাপক মানুষের আনাগোনা, সেটা কিন্তু কমে আসছে।

পাশের দেশ ভারতেও দেখতে পাচ্ছি, যারা মাইগ্রেন্ট ওয়ার্কার, যারা এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় গিয়ে কাজ করে, তাদেরকেও দেখতে পাচ্ছি বিহার থেকে উত্তর প্রদেশের দিকে ছুটে যাচ্ছে। বর্ডারে তাদের আটকাচ্ছে, জেলখানার মতো করে আটকে রাখছে, তার পরও কোনো কাজ হচ্ছে না।

তবে আমাদের এখানেও হবে। আমার মনে হয় শতকরা ৯০ ভাগ হয়ে গেছে। আর ১০ ভাগ বাকি। সেটাও হয়ে যাবে। এটা একটি দিক, আরেকটি দিক হচ্ছে, আমাদের দেশে সরকারি হিসাবেই তিন কোটি ৭৮ লাখ লোক দিনমজুর ও ভাসমান জনগোষ্ঠী। এরা ভাসমান ব্যবসা-বাণিজ্য করে। চায়ের দোকান, ফুটপাতে হকারি, হকার মার্কেটে ঘুরে ঘুরে ব্যবসা, চায়ের দোকান দিয়ে জীবন ধারণ করে। আমি চায়ের দোকানদারের সঙ্গে কথা বলে দেখেছি, একজন চায়ের দোকানদার দৈনিক এক-দেড় হাজার টাকা উপার্জন করে। এই উপার্জন দিয়ে তার সংসার চলে। এখন তার উপার্জন বন্ধ। তার কাছে কোনো সঞ্চয়ও নেই। এখন কী করবে! সে তো দোকান দিতে পারছে না। কাজেই সে মনের দুঃখে বাইরে ঘুরে বেড়াচ্ছে। এই মানুষগুলোও আস্তে আস্তে ঘরে ফিরছে।

এদের জন্য সরকারের যে সাহায্য ও প্রণোদনা সেটা খুব দ্রুতই দেওয়া উচিত। তাদের খাবার দেওয়া উচিত। তার পেটে যদি ভাত থাকে তাহলে সে ঘরে থাকবে। তখনই সে সরকারের নির্দেশ মানবে। এখন সরকারও চেষ্টা করছে বিভিন্ন জায়গায় সাহায্য দেওয়ার। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে, এই সাহায্য পৌঁছানোর যে স্তরগুলো, যাদের দিয়ে সাহায্য দেবে, তাদের ওপর সরকারের নিজেরই কোনো আস্থা নেই। এ বিষয়ে আমাদের অভিজ্ঞতাও খুবই খারাপ। ১৯৭৪ সালে বঙ্গবন্ধু নিজেই বলেছিলেন চাটার দল সব খেয়ে ফেলেছে। এত রিলিফ হলো, আমি তো দেখলাম না। রিলিফের ব্যাপারে আমাদের যে অভিজ্ঞতা, এটা তো ভালো না। তারপর ত্রাণসামগ্রী ও প্রণোদনা যা দেওয়ার তা দ্রুত পৌঁছাতে হবে। বিশেষ করে ওই তিন কোটি ৭৮ লাখ লোকের কাছে দ্রুত ত্রাণ পৌঁছাতে হবে। এই সংখ্যা কিন্তু কম নয়। পৃথিবীর অনেক দেশেরই এত জনসংখ্যা নেই, আবার অনেক দেশের জনসংখ্যা যোগ করেও হয়তো এত মানুষ হবে না।

আমাদের দেশের যেসব লোক অদৃষ্টবাদে বিশ্বাস করে তারা একধরনের শান্তিতেই আছে। খামখেয়ালিপনাও আছে। তিন কোটি ৭৮ লাখ লোক বা আমাদের জনসংখ্যার যে ৪ ভাগের ১ ভাগ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে আছে, তাদের পেটে ভাত দিতে হবে। ভাত দিতে পারলেই বলা যাবে, তুমি ঘরেই থাকো, ঘর থেকে বেরোলেই তোমার শাস্তি। শুধু শাস্তির ভয় দেখিয়ে পারা যাবে না। এদের খাদ্য দিতে হবে।

এই কঠিন কাজটি সরকারকে এখন করতে হবে। সরকার কাজটি করবে বলে বারবার আমাদের সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে জানাচ্ছে। এটা খুব দ্রুত বাস্তবায়ন করতে হবে।

ঘরবন্দি মানুষের সময় কাটানোটাও একটা বিষয়। আমি সময় কাটাই পত্রিকা পড়ে, গল্প পড়ে, উপন্যাস পড়ে। সিনেমাও দেখি। এর মধ্যে আমি সত্যজিৎ রায়ের সব ছবি আবার দেখলাম। মৃণাল সেনের ছবিগুলো আবার দেখলাম। বনফুলের গল্প অবলম্বনে তাপস সিংহের ছবিগুলো দেখলাম। কয়েকটি পত্রিকায় নিয়মিত কলাম লিখি, সেই লেখার কাজটিও করছি। তবে ক্রিয়েটিভ লেখালেখিটা এখন হচ্ছে না। সময় পেলে গানও শুনি। টেলিফোনে সবার সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করি।

শিক্ষিত লোকদের জন্য এই সময় বিশাল অবসর। এই সময় বাইরে না গিয়ে ঘরে থেকে লেখাপড়া করে সময়টা কাটাতে পারেন। যেহেতু বাড়িতে বন্ধুবান্ধব আসবে না, আমরাও বন্ধুবান্ধবদের বাড়িতে যাব না, এই সময়টা সত্যিকার অর্থেই বিস্তর অবসর এবং নির্বাচনের মতোই কাটাচ্ছি আমরা।

এই সময়টাকে আনন্দময় করে তোলা কঠিন। কারণ চারদিকে আতঙ্ক। জ্ঞান-বিজ্ঞানে এত পারঙ্গম পশ্চিমা দুনিয়া, তারাই আজ সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত এবং তারা কোনো পথ খুঁজে পাচ্ছে না। হাজার হাজার মানুষ মারা যাচ্ছে, কোনো প্রতিষেধক উদ্ভাবন হচ্ছে না। প্রতিষেধক পেতেও হয়তো আরো অনেক সময় লাগবে।

সবাইকে অনুরোধ করব—জীবনটাকে একটু সৃজনশীল করার চেষ্টা করুন, যাতে এই দিনগুলো ভবিষ্যতের কাজে লাগে।

আমার তো মনে হয়, এই করোনা পরিস্থিতি থেকে গেলে একটি নতুন ওয়ার্ল্ড অর্ডার আসতে পারে। যেমনটি হয়েছিল শিল্প বিপ্লবের সময় প্লেগের কারণে। তাতে কোটি কোটি লোক মারা গিয়েছিল। ফলে সামন্তবাদের জায়গায় বুর্জোয়াদের আবির্ভাব হলো। আমার মনে হয়, এখনকার ঘটনায় যেখানে সারা পৃথিবীই আতঙ্কিত ও আক্রান্ত, এ ঘটনা শেষ হওয়ার পর আমরা হয়তো একটি নতুন বিশ্ব দেখতে পাব। সেখানে হয়তো অস্ত্রের ঝনঝনানিটা কমে যাবে। কমিউনিজমের মতোই করোনাভাইরাস ধনী-দরিদ্র, রাজন্য-প্রজা সবাইকে একাকার করে ফেলেছে। সবাই এখন এক কাতারে। কাজেই একটা নতুন পৃথিবী হয়তো বা আসতে পারে। তবে কিসের বিনিময়ে যে সেটা আসবে, সেটাও ভাবার বিষয়, যেখানে সারা পৃথিবীর অর্থনীতি ধসে গেছে।