নিকট অতীতে মুসলিম জাতির কাছে জ্ঞান ছিল ধনভাণ্ডারের মতো, যা তারা খুঁজে বেড়াত। চিকিৎসাবিজ্ঞান ও ওষুধ প্রস্তুতকরণেও তারা পিছিয়ে ছিল না। মুসলিম চিকিৎসকদের প্রাথমিক প্রচেষ্টা ছিল প্রাকৃতিক উপায়ে স্বাস্থ্য সুরক্ষা করা—শরীরের স্বাভাবিক গতিধারাকে যতটা সম্ভব বাধাগ্রস্ত না করে। হিপোক্রেটিক দর্শন ‘প্রথমে ক্ষতি নয়’ ইসলামী দর্শনের অনুকূলে হওয়ায় তা মুসলিম চিকিৎসকদের কাছে বিশেষ গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছিল। মুহাম্মদ (সা.)-এর বাণী ‘তোমার ওপর তোমার শরীরেরও অধিকার রয়েছে’ মুসলিম বিজ্ঞানীদের স্বাস্থ্য, ওষুধ ও চিকিৎসাবিজ্ঞানে বিস্ময়কর অগ্রগতির পথ প্রশস্ত করেছিল।

ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ইসলামী সভ্যতায় ‘ওষুধশিল্প’ তিনটি স্তর অতিক্রম করে।

প্রথম স্তর : এই ধাপ শুরু হয় খ্রিস্টীয় সপ্তম শতকে। গ্রিক, পারসিয়ান, অ্যাসাইরিয়ান, ইন্ডিয়ান ও বাইজেন্টিয়ান চিকিৎসাবিজ্ঞানের গ্রন্থ অনুবাদের মাধ্যমে। মুসলিম চিকিৎসকরা অল্প সময়ের মধ্যেই সংগৃহীত জ্ঞানের ব্যাখ্যা, বিশ্লেষণ, সম্প্রসারণ, তার পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও প্রয়োগে সমর্থ হয়েছিলেন। এটা ছিল ইসলামী সভ্যতার সোনালি সময়। এই সময়ে মুসলিম চিকিৎসকরা চিকিৎসা, ওষুধ, ভেষজ, পুষ্টি ও উদ্ভিদবিজ্ঞানে মৌলিক অবদান রাখেন।

দ্বিতীয় স্তর : পরের ধাপটি ছিল খ্রিস্টীয় নবম শতক থেকে ১৩ শতক পর্যন্ত। অর্থাৎ শেষ স্তর—যখন মুসলিম জাতির পতন হয় এবং পুরো মুসলিম বিশ্বে এর প্রভাব পড়ে তার আগ পর্যন্ত এই যুগের সীমা। এই যুগে বহু আরব ও অনারব মুসলিম চিকিৎসাবিজ্ঞানী ওষুধ উদ্ভাবন ও ওষুধশিল্পের বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। তাঁদের মধ্যে আল রাজি (৮৪১-৯২৬ খ্রি.) ও ইবনে সিনা (৯৮০-১০৩৭ খ্রি.) ছিলেন চিকিৎসাবিজ্ঞানের প্রবাদপুরুষ। তাঁদের বই ও চিকিৎসা পদ্ধতি ইউরোপের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় পরবর্তী কয়েক শতাব্দী পর্যন্ত পাঠ্য ছিল।

নবম শতকে বাগদাদে হাসপাতাল প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর আল রাজির সুনাম ছড়িয়ে পড়ে। কেননা তিনি সেখানে মানসিক চিকিৎসার জন্য একটি বিভাগ খুলেছিলেন। শারীরিক ও মানসিক চিকিৎসার সমন্বয়, আধ্যাত্মিক আরোগ্য, রোগীর চিকিৎসা ও সেবাযত্ন সামগ্রিক ব্যাপারে তিনি অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। তিনি তাঁর বই ‘আত-তিব্বি আর রুহানি’তে এই সময় অভিজ্ঞতা লিপিবদ্ধ করেছেন। আল রাজি তাঁর এই গ্রন্থে সার্বিক রোগ নিরাময়ে আত্মিক পরিশুদ্ধতা, নৈতিকতা ও পুণ্যবান জীবনযাপনের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন।

ইবনে সিনা তাঁর ‘আল কানুন ফিত-তিব’ গ্রন্থে ‘প্রায়োগিক চিকিৎসাবিজ্ঞানে’র ভিত্তি স্থাপন করেছেন এবং তিনি রোগ প্রতিকারে একটি পূর্ণাঙ্গ পরামর্শ ও রূপরেখা তুলে ধরেছেন।

দশম শতকের শুরুতে মুসলিম চিকিৎসাবিজ্ঞানীরা চক্ষু রোগের চিকিৎসা এবং ছানি অপারেশন শুরু করেন। ইরাকের চক্ষুরোগ বিশেষজ্ঞ আল-মাওয়াসিলি সুইয়ের মাধ্যমে ছানি অপসারণের বিশেষ পদ্ধতি উদ্ভাবন করেন। দশম শতকের বাগদাদের অন্য চিকিৎসাবিজ্ঞানী আলী ইবনে ঈসা চক্ষুরোগের ওপর ‘নোট বুক অব দ্য অকুলিস্ট’ নামে একটি চমত্কার বই লেখেন। ইবনে ঈসার গুরুত্বপূর্ণ মতামতগুলোর ভিত্তি ছিল ইউরোপের আধুনিক চক্ষুবিদ্যার ওপর। সিরিয়ান মুসলিম বিজ্ঞানী ইবনে নাফিস ১২১০ খ্রিস্টাব্দে লেখা বইয়ে রক্ত পরিশোধনে হৃিপণ্ড ও ফুসফুসের ভূমিকা বিশ্লেষণ করেন এবং ইবনে সিনার ‘পালমোনারি সার্কুলেশন’ সংক্রান্ত তত্ত্বের ব্যাখ্যা দেন। ইবনে নাফিস মূলত হৃদ-প্রকোষ্ঠের শারীরিক গঠন এবং সার্কুলেটরি সিস্টেমের রূপরেখা তুলে ধরেন—পশ্চিমা বিশ্ব তা আবিষ্কারের শত বছর আগে।

আধুনিক ওষুধশিল্প ও প্রতিষেধক উদ্ভাবনেও মুসলিমরা মৌলিক অবদান রাখেন। নবম শতকে সাবুর ইবনে সাহল, আল রাজি ও ইবনে সিনা এ ক্ষেত্রে বিশেষ অবদান রাখেন। ১১ শতকে আল বেরুনি তাঁর বিখ্যাত ‘দ্য বুক অব ফার্মালজি’ রচনা করেন। যাতে তিনি ওষুধ ও প্রতিষেধক বিষয়ে বিস্ময়কর রূপরেখা ও তত্ত্ব প্রদান করেন। আল জাওয়াহিরি ‘আল তাসরিফ’ গ্রন্থে ওষুধ প্রস্তুত প্রণালি এবং সাধারণ প্রতিষেধক থেকে শুরু করে জটিল জটিল প্রতিষেধক তৈরির পদ্ধতি লিপিবদ্ধ করেন। এই যুগে ওষুধ তৈরি বা মিশ্রণের মূল ধারণা ছিল ‘ভারসাম্য’ রক্ষার অপরিহার্য নীতির ওপর। তাঁরা একজন চিকিৎসকের ভূমিকা নির্ণয় করতেন শারীরিক সব ক্রিয়ার সমন্বয় ও ভারসাম্য রক্ষার ওপর ভিত্তি করে। ফলে স্বাস্থ্য সুরক্ষা ও নিরাময়ের ক্ষেত্রে শারীরিক, আবেগসংশ্লিষ্ট, মানসিক ও আধ্যাত্মিক বিষয়গুলোকে সমানভাবে গুরুত্ব দিতেন।

শারীরিক অসুস্থতার কারণ হিসেবে মূলত শরীরে অতিরিক্ত বর্জ্য জমা হওয়াকে দায়ী করা হতো। এ ছাড়া অতিরিক্ত আহার, অনুপযুক্ত খাবার গ্রহণ ও অন্য অস্বাস্থ্যকর অভ্যাসগুলো রোগের উৎস হিসেবে বিবেচিত হতো। তাঁরা মনে করতেন, হজম প্রক্রিয়া ব্যাহত হলেই রোগের লক্ষণগুলো ফুটে ওঠে। এর চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো মুসলিম চিকিৎসকদের মৌলিক বিশ্বাস ছিল ‘শরীর’ একজন চিকিৎসকের একমাত্র মনোযোগের বিষয় হতে পারে না; বরং আত্মা একটি অপরিহার্য বিষয়—যা শরীরে জীবনীশক্তি ও মৌলিক উপাদান সরবরাহ করে।

তৃতীয় স্তর : ১৪ শতকে মুসলিম সভ্যতায় সমৃদ্ধ চিকিৎসাবিজ্ঞানের তৃতীয় ধাপের সূচনা হয়। এই সময় চিকিৎসাশাস্ত্রের ওপর নতুন ধরনের গ্রন্থ রচনা শুরু হয়। এই সময়ের লেখকরা যতটা ধর্মীয় পণ্ডিত ছিলেন, ততটা চিকিৎসক ছিলেন না। ফলে তাঁদের প্রধান লক্ষ্য হয় স্বাস্থ্যবিষয়ক জ্ঞান ও পশ্চিমা বিশ্বের উত্থানের আগ পর্যন্ত মুসলিম সমাজে অনুসৃত চিকিৎসা পদ্ধতি লিপিবদ্ধ করা। একই নামে এই সময় একাধিক গ্রন্থ রচিত হয়। যেমন, তিব্বে নববী—যাকে গ্রিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের বিকল্প মনে করা হতো। এই সময়ের লেখকদের মধ্যে ইমাম জাওঝি, সুয়ুতি, জাহাবি (রহ.) প্রমুখ উল্লেখযোগ্য। তাঁদের রচিত গ্রন্থগুলোই এখন ‘ইসলামী চিকিৎসা’ হিসেবে উদ্ধৃত।

রোগীদের প্রতি ইমাম জাওঝির চিকিৎসা পরামর্শে প্রাথমিক যুগের মুসলিম চিকিৎসকদের ‘ভারসাম্য নীতি’ ও ‘সামগ্রিক বিবেচনা’র প্রতিফলন দেখা যায়। তিনি চিকিৎসকদের পরামর্শ দিয়েছেন রোগীর জীবনের সব দিক পর্যালোচনা করতে এবং ওষুধ প্রয়োগের আগে রোগের প্রকৃত কারণ বের করতে রোগীর অনুভূতি, মানসিক অবস্থা, জীবন প্রণালি ও খাদ্যাভ্যাস খতিয়ে দেখতে। মুসলিম চিকিৎসকরা ‘হৃদয় ও আত্মার রোগ’ সম্পর্কে বিশেষ জ্ঞান রাখতেন। পেশাগত জীবনে তাঁরা ছিলেন অত্যন্ত উত্তম আচরণ ও শিষ্টাচারের অধিকারী। তাঁরা রোগীর ওপর পারিপার্শ্বিক চাপ, আবেগ ও মানসিক অবস্থার প্রভাব নির্ণয় করতে পেরেছিলেন। মুসলিম চিকিৎসকরা রোগ নিরাময়ের ব্যাপারে রোগীর মনে আশা ও মানসিক শক্তি বৃদ্ধি করতে কোরআন ও মুহাম্মদ (সা.)-এর আশাব্যঞ্জক বাণী উদ্ধৃত করতেন। রোগীর অন্তরজগতের নিরাময়ে তাঁরা নৈতিক মূল্যবোধ, ভালোবাসা, সাহস, উদারতা ও পরোপকারের পরামর্শ দিতেন। আল্লাহর সঙ্গে সংযোগ স্থাপনের পাশাপাশি শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের সুরক্ষা, বিশ্বাসের দৃঢ়তা, সুখী জীবন লাভ ও রোগবালাইয়ের বিরুদ্ধে শরীরে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে তাঁরা নিয়মিত ইবাদতের গুরুত্ব দিতেন। ইমাম সুয়ুতি (রহ.)-এর বক্তব্যেও প্রাথমিক যুগের চিকিৎসাবিদ্যার প্রভাব দেখা যায়। যেমন তিনি বলেন, রোগ থেকে বাঁচতে ছয়টি প্রাথমিক বিষয়ে মানুষের ভারসাম্য অর্জন করতে হয়। ইমাম সুয়ুতি যে বায়ু আমরা গ্রহণ করি, যে খাবার ও পানীয় ভোগ করি, শারীরিক অনুশীলন ও চলাফেরা, আমাদের সংবেদনশীলতা ও অনুভূতি, ঘুম ও জাগরণ চক্র, শরীরের বিষাক্ত পদার্থ নির্গত করার ক্ষমতা, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা এবং প্রয়োজনীয় পুষ্টি বজায় রাখার ওপর গুরুত্ব দেন। তিনি লেখেন, ‘যখন সাধারণ প্রতিষেধক ব্যবহার সম্ভব, তখন ভারী প্রতিষেধক ব্যবহার কোরো না।’ চিকিৎসকদের উদ্দেশে ইমাম সুয়ুতি (রহ.) বলেন, ‘তারা যেন কথায় বিনয়ী হয়, তাদের বাক্যে মমতা থাকে এবং তারা যেন স্রষ্টার নৈকট্য অর্জন করে।’

ইমাম জাহাবি (রহ.) বলেন, ‘নিয়মিত ওষুধ ব্যবহারের সঙ্গে অনুরূপ খাবার গ্রহণে কোনো খারাপ প্রতিক্রিয়া নেই—যাতে কোনো ক্ষতিকর পদার্থ থাকে না।

সপ্তম শতাব্দীতে যাত্রা শুরু করার পর থেকে চিকিৎসাবিজ্ঞানে মুসলিম চিকিৎসকরা অসামান্য অবদান রাখেন। ১৪ শতকের পর পশ্চিমা বিশ্বে জ্ঞান-বিজ্ঞানের রেনেসাঁ ও মুসলিম বিশ্বের রাজনৈতিক পতনের পর ইসলামী চিকিৎসা পদ্ধতি ও ওষুধ-বিজ্ঞান নতুন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে এবং শেষ পর্যন্ত পশ্চিমা চিকিৎসা পদ্ধতিই পৃথিবীতে জায়গা করে নেয়। তবু আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের অনেকেই মনে করেন রোগ নিরাময় ও ওষুধশিল্পে মুসলিম চিকিৎসা পদ্ধতি ও সমকালীন চিকিৎসা পদ্ধতির সমন্বয় হতে পারে। বিশেষত রোগ নিরাময়ে রোগীর সংবেদনশীলতা, মানসিক ভারসাম্য ও আত্মিক অবস্থা বিবেচনার যে নীতিমালা মুসলিম চিকিৎসকরা অনুসরণ করতেন তা পশ্চিমা বিশ্বে দিন দিন জনপ্রিয় হচ্ছে।